ভবনের ইতিহাস

বঙ্গবন্ধু ভবনের ইতিহাস

1._32_House

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি বিজড়িত এই বাড়িটি বাঙালির জাতিসত্ত্বার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মুক্তির ঠিকানা। এই বাড়ি থেকেই বাঙালি জাতি পেয়েছিলো মুক্তির দিক নির্দেশনা ও স্বাধীনতার ঘোষণা। এই বাড়ি থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে এনে দিয়েছিলেন কাঙ্খিত স্বাধীন সার্বভৌম ভূখন্ড ও লাল সবুজের পতাকা। এই বাড়িতেই শেখ মুজিবুর রহমান থেকে বঙ্গবন্ধু এবং বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির পিতায় রূপান্তরিত হয়েছেন। এই বাড়িতেই বঙ্গবন্ধু সপরিবারে জীবন উৎসর্গ করেছেন।

বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীবনের অধিকাংশ সময় কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে অথবা সাংগঠনিক কাজে দেশের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়িয়েছেন। তাই সংসার বাড়ি-ঘরের খোঁজখবর রাখা তাঁর পক্ষে খুব একটা সম্ভব হতো না। সংসার সামলাতেন তাঁর সহধর্মিণী মহিয়সী নারী বঙ্গমাতা বেগম শেখ ফজিলাতুননেছা মুজিব। ১৯৫৭ সালের ২১ মে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটিতে দলীয় সদস্যদের সাংগঠনিক পদ অথবা মন্ত্রিত্ব দু’টির মধ্যে যেকোন একটি বেছে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। বঙ্গবন্ধু মন্ত্রীত্ব ছেড়ে দলের সাংগঠনিক কাজে মনোনিবেশ করার জন্য সাধারণ সম্পাদক পদ বেছে নেন।

আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করার সময় বঙ্গবন্ধু চা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে সপরিবারে সেগুন বাগিচার ১১৫ নম্বর সরকারি বাড়িতে বসবাস করতেন। ১৯৫৮ সালের ১২ অক্টোবর ওই বাড়ি থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয় এবং তিন দিনের মধ্যে বাড়ি ছেড়ে দেয়ার নোটিশ দেয়া হয়। অবশেষে বেগম মুজিব সিদ্ধেশ্বরী এলাকায় মাসিক ২০০ টাকায় বয়েজ স্কুলের মাঠের পাশে পুলিশ কর্মকর্তার মালিকাধীন বাড়ি ভাড়া নেন। সরকারি এজেন্সির হুমকি ধমকির মুখে মালিক এ বাড়িটিও ছাড়তে অনুরোধ করেন। পরে বেগম সুফিয়া কামালের প্রচেষ্টায় সেগুন বাগিচার ৭৬ নম্বর বাড়িতে মাসিক ৩০০ টাকা ভাড়ায় ওঠেন।

১৯৫৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মন্ত্রী থাকাকালীন একান্ত সচিব নূরুজ্জামান বেগম মুজিবের অনুরোধে ধানমন্ডি এলাকার জমির জন্য গণপূর্ত বিভাগে আবেদনপত্র জমা দেন। তখনকার দিনে জমি নেয়ার লোক ছিল না। ১৯৫৭ সালে ছয় হাজার টাকায় ধানমন্ডিতে এক বিঘার জমি বরাদ্দ দেয়া হয়। ১৯৬০ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর বঙ্গবন্ধু ও বেগম মুজিব পরামর্শ করে বাড়ি করার সিদ্ধান্ত নেন এবং একই সালে বাড়ির কাজে হাত দেন।

১৯৬১ সালের ১ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরিবার-পরিজন নিয়ে নির্মাণাধীন এই বাড়িতে ওঠেন। তখন একতলা বাড়িটিতে মাত্র দু’টি শয়নকক্ষ ছিলো যার একটি কক্ষে বঙ্গবন্ধু দম্পতি থাকতেন। ১৯৬৬ সালে দ্বিতীয় তলার নির্মাণ কাজ শেষ হবার পূর্ব পর্যন্ত নিচতলার এই কক্ষেই বঙ্গবন্ধু দম্পতি থাকতেন। দ্বিতীয় তলায় বসবাস শুরু হলে এই কক্ষটি তিনি গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহার করতেন। উত্তর পাশের লাগোয়া কক্ষে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা থাকতেন। এই কক্ষেরই একপাশে থাকতেন শেখ কামাল ও শেখ জামাল। বাড়িতে ঢুকতেই ছিলো ছোট একটি কক্ষ, যা ড্রয়িং রুম হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

এই ঐতিহাসিক বাড়িটি বাঙালির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে স্মৃতি সংরক্ষণ করে চলেছে। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা অর্জন সময়কালের সকল দিক নির্দেশনা এই বাড়ি থেকেই পাওয়া গিয়েছিল। ১৯৬২ সালে আইয়ুব বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে বহু নেতা এই বাড়িতে শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আলোচনা করতেন ও নির্দেশনা নিতে আসতেন। ১৯৬২ সালে তিনি এই বাড়ি থেকেই গ্রেফতার হন।

১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের সফল নির্বাচন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরী সিদ্ধান্ত এই বাড়ি থেকেই দেওয়া হতো। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর এই বাড়ি থেকেই বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে যে দিক-নির্দেশনা দিতেন সেই মোতাবেক দেশ পরিচালিত হতো। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ বাঙালি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান এই বাড়িতেই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী অপারেশন ‘সার্চ লাইট’ নামে নিরীহ-নিরস্ত্র বাঙালির উপর নির্বিচারে হত্যা ও গণহত্যা চালায়। এ খবর পেয়ে বঙ্গবন্ধু এই বাড়ির নিচ তলায় তাঁর ব্যাক্তিগত গ্রন্থাগার থেকে টেলিফোনে রাত ১২.৩০ মিনিটে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যার যা কিছু আছে তা নিয়ে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন। তাঁর স্বাধীনতা ঘোষণার খবর ওয়্যারলেস ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দেয়া হয়।

এই বাড়ি থেকেই ২৫ মার্চ রাত ১.৩০ মিনিট তথা ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালি জাতির পিতাকে গ্রেফতার করে প্রথমে ঢাকা সেনানিবাস ও পরে পাকিস্তানের পাঞ্জাবের মিওয়ানওয়ালি কারাগারে বন্দি করে রাখে। বাংলাদেশ বিজয় লাভ করার পূর্ব পর্যন্ত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাড়িটি দখল করে রাখে। অপরদিকে ধানমন্ডির ১৮নং সড়কের ২৬ নম্বর বাড়িতে মুজিব পরিবারকে বন্দি করে রাখা হয়।

১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডন ও দিল্লী হয়ে ১০ জানুয়ারি তাঁর প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে আসেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর গুলির আঘাতে ঝাঁঝরা হয়েছিলো এই বাড়িটি। তাই তিনি নিজ বাড়িতে উঠতে পারেননি। ১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। বাড়ির মেরামত কাজ শেষ হওয়ার পর তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর পরিবার নিয়ে সরকারি বাসায় না উঠে ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে এই বাড়িতে বসবাস করতে লাগলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এই বাড়ি থেকেই বঙ্গবন্ধু যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ গড়ায় নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন এবং তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হওয়া বাংলাদেশ নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পায়।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের মত জীবন যাপন করতেন। তাই তিনি সরকারি বাসভবনে বসবাস না করে এই বাড়িতে সপরিবারে বসবাস করতেন। এই বাড়ির সিঁড়ি ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালের ভোররাতে জাতির জনকের রক্তে ভেসে যায়। একে একে ঘাতকরা হত্যা করে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুননেছা মুজিব (বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী), শেখ কামাল (বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র), শেখ জামাল (বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় পুত্র), শেখ রাসেল (বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ পুত্র), শেখ আবু নাসের (বঙ্গবন্ধুর একমাত্র ছোট ভাই), সুলতানা কামাল খুকু (শেখ কামালের স্ত্রী), পারভীন জামাল রোজী (শেখ জামালের স্ত্রী)। বঙ্গবন্ধু পরিবারের মোট ৮ জনকে হত্যা করা হয়। এই বাড়ির আঙিনায় স্পেশাল ব্রাঞ্চের এ্যসিসট্যান্ট সাব ইন্সপেক্টর সিদ্দিকুর রহমানকে হত্যা করা হয়।

ইতিহাসের এ ঘৃণ্যতম হত্যাকান্ডের এই দিনে বঙ্গবন্ধুর পরিবারসহ সর্বমোট ৩৩ জনকে হত্যা করা হয়েছিল। স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কতিপয় রাজনীতিক ও সামরিক কর্মকর্তার উচ্চাভিলাষ, ক্ষমতালিপ্সা চরিতার্থ করতে এবং স্বাধীনতাকে গলা টিপে হত্যা করার জন্য ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে ইতিহাসের জঘন্যতম ও নৃশংসতম হত্যাকান্ড ঘটেছিল।

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করার পর ঘাতকচক্র এই বাড়িটি সীল করে রাখে এবং বাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। ১৯৮১ সালের ১৭ মে বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসেন। তিনি বাড়িটিতে প্রবেশ করতে চাইলে সামরিক সরকার তাঁকে ঢুকতে দেয়নি। তখন তিনি বাড়ির সামনের রাস্তায় দোয়া-দুরূদ পড়েন। অবশেষে ১৯৮১ সালের ১০ জুন বাড়িটি তাঁর নিকট হস্তান্তর করা হয়। তিনি বাড়িতে ঢুকেই ধূলাবালিতে পরিপূর্ণ, রক্ত শুকনো মেঝে, রক্তে মাখা জামাকাপড়, প্রত্যেকটি জিনিস তছনছ ও এলোমেলো অবস্থায় দেখতে পান।

পরবর্তীতে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা চিন্তা করলেন তাঁরা আর এই বাড়িতে বসবাস করবেন না, জনগণের জন্য উন্মুক্ত করবেন। কারণ, তাঁদের পিতা বাঙালি জাতিকে ভালবেসে এই বাড়িতেই তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাই ১৯৯৪ সালের ১৪ আগস্ট এই ঐতিহাসিক বাড়িটিকে জাদুঘরে রূপান্তরিত করা হয়।

২০১১ সালের ২০ আগস্ট শনিবার মূল ভবনের উত্তরে সম্প্রসারিত ভবন উদ্বোধন করা হয়। ষষ্ঠ তলা ভবনে ২৬টি পর্বে বঙ্গবন্ধুর তথ্য ও সচিত্র ঘটনাবলি তুলে ধরা হয়েছে। সম্প্রসারিত ভবনের ৫ম তলায় একটি লাইব্রেরি রয়েছে। শৈশব থেকে ১৯৭০-এর নির্বাচন পর্যন্ত ৪র্থ তলায় তুলে ধরা হয়েছে। তৃতীয় তলায় ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে ১৯৭৩ সালের দেশ পুনর্গঠন পর্যন্ত সচিত্র তথ্য সংযোজন করা হয়েছে। পারিবারিক জীবন থেকে জীবনাবসানের মর্মান্তিক ঘটনাবলী ২য় তলায় সন্নিবেশিত। দর্শক ৪র্থ তলা থেকে শুরু করে ক্রমান্বয়ে নীচের দিকে নামতে পারেন। নীচতলা অডিটরিয়াম, সভা, সেমিনারের জন্য ব্যবহৃত হয়। এরপর মূল ভবনে যেতে পারেন।

ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধুর বাসভবনকে জাদুঘরে পরিণত করা প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা বলেন, এই বাড়িকে ঘিরে সবসময় আমাদের একটা চিন্তা ছিল যে, এমন একটা কিছু করব যা ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকবে। একমাত্র আমরা দুই বোন। থাকার মতো জায়গাও ছিল না, তারপরও বাড়িটি জাদুঘরের জন্য দিয়ে দিয়েছি। ১৯৮১ সালে দেশে ফেরার পর নানা প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে ফেরার পর আমাদের কেউ বাড়ি ভাড়া দিত না। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর আমাদের দেশে ফিরতে দেয়া হয়নি। দেশে ফেরার পরও আমাদের ধানমন্ডির বাড়িতে ঢুকতে দেয়া হয়নি। একরাত ছোট ফুপুর বাড়িতে, একদিন মেঝো ফুপুর বাড়িতে এইভাবে আমাকে থাকতে হতো। তারপরও আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল আমরা এটাকে স্মৃতি জাদুঘর করব এবং আমরা সেটা করেছি।