ভবনের তৃতীয় তলা

শেখ কামালের কক্ষ

13._Sheikh_Kamal_Room

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল ১৯৪৯ সালের ৫ই আগস্ট গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তুরস্কের জাতির পিতা মহামতি কামাল আতাতুর্কের নাম অনুসারে বঙ্গবন্ধু তার নাম রেখেছিলেন শেখ কামাল। শাহীন স্কুল থেকে ১৯৬৭ সালে মাধ্যমিক ও ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৬৯ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৭৪ সালে বি.এ(অনার্স) পাস করেন এবং ১৯৭৫ সালে একই বিভাগ থেকে এম.এ পরীক্ষা দেন কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট তাকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হলে তিনি তার পরীক্ষার ফলাফল দেখে যেতে পারেননি। ১৯৭৬ সালের জানুয়ারি মাসে ফলাফল বের হলে তিনি এম.এ পাস করেন। তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের একজন সংগ্রামী আদর্শবাদী সংগঠক হিসাবে ১৯৬৬ সালের ৬ দফা ও ১৯৬৯ এর গণআন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতেই তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তিনি লেফটেন্যান্ট হিসেবে কর্নেল ওসমানীর এডিসির দায়িত্ব পালন করেন। বঙ্গবন্ধু পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মতো তারও সাদাসিধে জীবনযাপন ছিল। তিনি শিল্পানুরাগী ছিলেন। মঞ্চ নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে একনিষ্ঠ সংগঠক ছিলেন। ১৯৭৩ সালে ঢাকা থিয়েটার প্রতিষ্ঠা করা হয়। শেখ কামাল ঢাকা থিয়েটারের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। অভিনেতা হিসেবে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যাঙ্গনে বিশেষ অবদান রেখেছিলেন। শেখ কামালের অভিনীত নাটকগুলোর মধ্যে 'আমি মন্ত্রী হব', 'শিল্পপতি', 'রুলার এন্ড নিহিত এলএমজি', 'নবান্ন', 'দানব', 'কেউ কিছু বলতে পারে না', 'কার্টুন', 'সম্রাট', 'জন্ডিস', 'বিবিধ বেলুন', 'রূপান্তর' ও 'বিদায় মোনালিসা অন্যতম'। সেতার ও অর্গান বাজাতে খুব ভালবাসতেন। খুব সুরেলা কণ্ঠে গান গাইতেন। তিনি বিএএফ শাহীন কলেজে পড়ার সময় আন্তঃকলেজ সেতার প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে প্রথম এবং সংগীত প্রতিযোগিতায় সারাদেশের মধ্যে দ্বিতীয় হন। তিনি স্পন্দন নামে একটি শিল্পগোষ্ঠী গঠন করেছিলেন। ফিরোজ সাঁই, ফেরদৌস ওয়াহিদ ও আরো অনেকে শেখ কামালের নিজ হাতে গড়া স্পন্দন শিল্পগোষ্ঠীর সদস্য ছিলেন এবং গান গাইতেন। স্পন্দন বিভিন্ন মাজার থেকে আধ্যাত্মিক গান ও গ্রাম থেকে লোকজ সঙ্গীত সংগ্রহ করে সংস্কৃতি ও লোকসাহিত্যের সঙ্গে আধুনিক মননে সম্পর্ক তৈরি করে সেতু বন্ধন রচনায় সচেষ্ট ছিলেন।

তিন তলার এই কক্ষের সামনে ছাদে বসে মাঝে মাঝে গান অনুশীলন করতেন। শৈশব থেকে তাঁর খেলাধুলায় প্রচণ্ড উৎসাহ ছিল। ১৯৭২ সালে তিনি আবহানী ক্রিয়াচক্র প্রতিষ্ঠা করেন। বাস্কেটবল,ক্রিকেট,ফুটবল ও হকি ছিলো তার প্রিয় খেলা। ১৯৭৪ সালে শেখ কামালের নেতৃত্ব আবহানী ক্লাব ফুটবল, ক্রিকেট ও হকিতে চ্যাম্পিয়ান হয়ে এক অনন্য ইতিহাস গড়ে। ১৯৭৫ সালের ১৪ জুলাই বিশিষ্ট ক্রীড়াবিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতি ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয় ব্লু খ্যাত সুলতানা খুকীর সাথে তার বিয়ে হয়। ১৪ই জুলাই বিয়ের পর তিনি স্ত্রী সুলতানা খুকীর সাথে তিন তলার এই কক্ষে বসবাস শুরু করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যাকারীরা যখন এই বাড়িতে আক্রমণ চালায় শেখ কামাল হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলে। হত্যাকারীরা শেখ কামালকে প্রথমেই নিচ তলার অফিস কক্ষের দরজার সামনে হত্যা করে ও তার স্ত্রী সুলতানা কামাল খুকীকে বঙ্গবন্ধুর শয়নকক্ষে পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে হত্যা করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের সময় এই কক্ষের মূল্যবান জিনিসপত্র লুটপাট করা হয়। সে সময়ে বিভিন্ন জিনিসপত্র বিক্ষিপ্তভাবে রাখা হয়েছিল। এরপর ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত বাড়িটি সামরিক কর্তৃপক্ষ সিলগালা করার কারণে দীর্ঘদিন অযত্ন-অবহেলায় থাকায় ধুলাবালি, পোকামাকড়ে অধিকাংশ জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। বিছানার পাশে টেবিলে আজও প্রদর্শিত রয়েছে ১৫ই আগস্ট রাতে ব্যবহৃত পানির গ্লাস, প্লেট ও চামচ। ভিতরে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে নবপরিণীতা স্ত্রী সুলতানা কামাল খুকুর ড্রেসিং টেবিলে প্রসাধনী সামগ্রী। শেখ কামালের সেতার, কীবোর্ড, সাউন্ড বক্স, গানের রেকর্ড ও তার খেলাধুলায় পদক, সনদ এবং শীল্ড আজও প্রদর্শিত হচ্ছে। এই কক্ষের দক্ষিণের জানালার কাঁচে একটি গুলির চিহ্ন রয়েছে।